ঢাকা ০৫:২৪ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬, ২১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্য খেজুর গাছ বিলুপ্তির পথে!

  • প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৯:৩৫:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ জুন ২০২৪
  • ৫৩২ বার পড়া হয়েছে

শীতের সময় গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয় খেজুরের রস। গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে খেজুর রসের সমারোহ ছিল এক সময় খেজুর গাছ হতে ফোঁটা ফোঁটা সঞ্চিত রস নির্গত হবে চোং দিয়ে। হাঁড়িতে জমে রসের ফোঁটা। এভাবে একটি গাছ দৈনিক গড়ে ৪-৫ লিটার রস দিয়ে থাকে। কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ গ্রামীন জনপদে বিরল। শীতের সকালে খেজুর রস, মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসি এখন আর দেখা যায়না। অবৈধ ইট ভাটায় খেজুর গাছ কেটে ইটপোড়ানোর কারনেই খেজুর গাছ শূন্য হয়ে পড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে বলে উপজেলার বিজ্ঞজন মনে করেন।

বিগত কয়েক বছর থেকে বরগুনার আমতলীর গ্রামীন জনপদের খেজুর গাছগুলো তদারকির অভাবে ও ইটভাটায় খেজুর গাছ কেটে ইটপোড়ানোর কারনে বিলুপ্তির পথে। গ্রামীন এই ঐতিহ্য রক্ষানাবেক্ষনে সরকারি উদ্যোগ না থাকায় খেজুর গাছ ও রসের সংকট দেখা দিয়েছে। একসময় গ্রামীন জনপদে খেজুর রস নিয়ে পায়েস পিঠার উৎসব, রাত জেগে সিন্নি রেঁধে খাবার উৎসব, গভীর রাতে গাছে গাছে ঝুলে খেজুরের রস খাওয়া সহ অনেকের জীবনে রাতের আধাওে অপরের গাছের রস খাওয়া শৈশবের অম্লান স্মৃতি হয়ে আছে আজো।

গ্রামঞ্চলের মেঠোপথ আর খেজুর গাছের সারির সেই মুগ্ধতা আজ বিলীন হবার পথে। প্রকৃতির তৈরি চোখ জুড়ানো খেজুর গাছের সারি আর রসের হাঁড়ির দেখা মিলে না এখন আর। দোয়েল, বুলবুলি, শালিকসহ নানা রকম পাখি রসের চুঙ্গিতে বসে রস খাচ্ছে আর উড়াল দিচ্ছে, মৌমাছিরাও রস খাওয়ার আশায় ভোঁ ভোঁ করে উড়ে বেড়ায় না।

আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের গাছি মো. জামাল মিয়া বললেন আগে রস বিক্রির জন্য হাটে যেতে হতো। আর এখন গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামাতে দেরি হয় কিন্তু হাঁড়ি শেষ হতে দেরি হয় না। সকাল ৭টার ভেতরে শেষ হয়ে যায় রসের হাঁড়ি। ঠিক এমনই চিত্র এখন উপজেলার সকল গ্রামেরই। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে খেজুর গাছের সংখ্যা ও গাছি কমতে কমতে দুই দশকের তুলনায় এক দশমাংশই বিলুপ্ত প্রায়। কিন্তু কমেনি খেজুরের রসের গ্রাহক সংখ্যা। কমেনি এর কদর ও চাহিদা।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার খেজুর ছিল এক সময় এখন তা খুজে পাওয়া মুশকিল বলে অভিমত পর্যবেক্ষক মহলের। অথচ গ্রামীন জনপদের ঐতিহ্যবাহী কিছু গাছের মধ্যে খেজুর গাছ ছিল অন্যতম। শীত আসলেই খেজুরের রস ও খেজুরের মিঠা গ্রামীন জনপদ মৌ মৌ করতো। শীত আসলেই গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়তো খেজুর গাছ রসের উপযোগী করতে পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত হতে। এতে গাছিরা এই সময় অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতো। কালের বিবর্তনে অর্থনীতির চাকাকে চাঙ্গা করতে গিয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক গাছের মত খেজুর গাছকেও কেটে ফেলা হচ্ছে।

ফলে বিভিন্ন পিঠা, পুলি ও পায়েসসহ নানা প্রকার খাবার তৈরির জন্য খেজুরের রস ছিল অন্যতম উপাদান। এ জন্য গাছিদের চাহিদার কথা বলে রাখতে হতো। ফলে যাদের খেজুর গাছ ছিল না তারাও রস খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতেন না। তখন শীতে আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করত। পৌষ-মাঘ শীত মৌসুম এলে গাছিদের আনন্দের সীমা থাকত না। খেজুরের রস সংগহের জন্য মহাব্যস্ত হয়ে পড়তেন তারা। আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউপির সদস্য মো. তোতা মিয়া বলেন ছোট বেলা থেকে এখনো কাঁচা রসের পায়েস খাওয়ার কথা এখনো ভুলতে পারি না। আমাদের নাতি-নাতনীরা তো আর সেই পিঠা, পুলি-পায়েস খেতে পায় না।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ করা হয় না। শীত মৌসুমে সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা বলে শেষ করা যাবে না। কৃষি বিভাগতেও কখনো খেজুরের গাছ আবাদ নিয়ে কথা বলতে বা, কৃষি মেলায় খেজুরের গাছ রোপণে উদ্বুদ্ধ করার পরামর্শ দেয়া হয় না। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যে খেজুর ছিল এ অঞ্চলে অর্ধশতাধিক অবৈধ ইট ভাটায় খেজুর গাছ কেটে ইটপোড়ানোর কারনেই খেজুর গাছ শূন্য হয়ে পড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে বলে উপজেলার বিজ্ঞজন মনে করেন।

এই বিষয়ে আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সি এস রেজাউল করিম বলেন, এই ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের বিষয়ে আমরাও আগামীদিনে উদ্যোগ গ্রহণ করবো।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

Raihan

জনপ্রিয় সংবাদ

গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্য খেজুর গাছ বিলুপ্তির পথে!

আপডেট সময় : ০৯:৩৫:৩৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ জুন ২০২৪

শীতের সময় গ্রামীণ সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয় খেজুরের রস। গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে খেজুর রসের সমারোহ ছিল এক সময় খেজুর গাছ হতে ফোঁটা ফোঁটা সঞ্চিত রস নির্গত হবে চোং দিয়ে। হাঁড়িতে জমে রসের ফোঁটা। এভাবে একটি গাছ দৈনিক গড়ে ৪-৫ লিটার রস দিয়ে থাকে। কাকডাকা ভোরে খেজুরের রস, মন মাতানো ঘ্রাণ গ্রামীন জনপদে বিরল। শীতের সকালে খেজুর রস, মিষ্টি রোদ, কৃষক-কৃষাণির হাসি এখন আর দেখা যায়না। অবৈধ ইট ভাটায় খেজুর গাছ কেটে ইটপোড়ানোর কারনেই খেজুর গাছ শূন্য হয়ে পড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে বলে উপজেলার বিজ্ঞজন মনে করেন।

বিগত কয়েক বছর থেকে বরগুনার আমতলীর গ্রামীন জনপদের খেজুর গাছগুলো তদারকির অভাবে ও ইটভাটায় খেজুর গাছ কেটে ইটপোড়ানোর কারনে বিলুপ্তির পথে। গ্রামীন এই ঐতিহ্য রক্ষানাবেক্ষনে সরকারি উদ্যোগ না থাকায় খেজুর গাছ ও রসের সংকট দেখা দিয়েছে। একসময় গ্রামীন জনপদে খেজুর রস নিয়ে পায়েস পিঠার উৎসব, রাত জেগে সিন্নি রেঁধে খাবার উৎসব, গভীর রাতে গাছে গাছে ঝুলে খেজুরের রস খাওয়া সহ অনেকের জীবনে রাতের আধাওে অপরের গাছের রস খাওয়া শৈশবের অম্লান স্মৃতি হয়ে আছে আজো।

গ্রামঞ্চলের মেঠোপথ আর খেজুর গাছের সারির সেই মুগ্ধতা আজ বিলীন হবার পথে। প্রকৃতির তৈরি চোখ জুড়ানো খেজুর গাছের সারি আর রসের হাঁড়ির দেখা মিলে না এখন আর। দোয়েল, বুলবুলি, শালিকসহ নানা রকম পাখি রসের চুঙ্গিতে বসে রস খাচ্ছে আর উড়াল দিচ্ছে, মৌমাছিরাও রস খাওয়ার আশায় ভোঁ ভোঁ করে উড়ে বেড়ায় না।

আমতলী উপজেলার চাওড়া ইউনিয়নের গাছি মো. জামাল মিয়া বললেন আগে রস বিক্রির জন্য হাটে যেতে হতো। আর এখন গাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামাতে দেরি হয় কিন্তু হাঁড়ি শেষ হতে দেরি হয় না। সকাল ৭টার ভেতরে শেষ হয়ে যায় রসের হাঁড়ি। ঠিক এমনই চিত্র এখন উপজেলার সকল গ্রামেরই। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে খেজুর গাছের সংখ্যা ও গাছি কমতে কমতে দুই দশকের তুলনায় এক দশমাংশই বিলুপ্ত প্রায়। কিন্তু কমেনি খেজুরের রসের গ্রাহক সংখ্যা। কমেনি এর কদর ও চাহিদা।

উপজেলার বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার খেজুর ছিল এক সময় এখন তা খুজে পাওয়া মুশকিল বলে অভিমত পর্যবেক্ষক মহলের। অথচ গ্রামীন জনপদের ঐতিহ্যবাহী কিছু গাছের মধ্যে খেজুর গাছ ছিল অন্যতম। শীত আসলেই খেজুরের রস ও খেজুরের মিঠা গ্রামীন জনপদ মৌ মৌ করতো। শীত আসলেই গাছিরা ব্যস্ত হয়ে পড়তো খেজুর গাছ রসের উপযোগী করতে পরিষ্কারের কাজে ব্যস্ত হতে। এতে গাছিরা এই সময় অর্থনৈতিক ভাবে স্বাবলম্বী হতো। কালের বিবর্তনে অর্থনীতির চাকাকে চাঙ্গা করতে গিয়ে গ্রামীণ ঐতিহ্যের অনেক গাছের মত খেজুর গাছকেও কেটে ফেলা হচ্ছে।

ফলে বিভিন্ন পিঠা, পুলি ও পায়েসসহ নানা প্রকার খাবার তৈরির জন্য খেজুরের রস ছিল অন্যতম উপাদান। এ জন্য গাছিদের চাহিদার কথা বলে রাখতে হতো। ফলে যাদের খেজুর গাছ ছিল না তারাও রস খাওয়া থেকে বঞ্চিত হতেন না। তখন শীতে আনন্দময় পরিবেশ বিরাজ করত। পৌষ-মাঘ শীত মৌসুম এলে গাছিদের আনন্দের সীমা থাকত না। খেজুরের রস সংগহের জন্য মহাব্যস্ত হয়ে পড়তেন তারা। আমতলী উপজেলার কুকুয়া ইউপির সদস্য মো. তোতা মিয়া বলেন ছোট বেলা থেকে এখনো কাঁচা রসের পায়েস খাওয়ার কথা এখনো ভুলতে পারি না। আমাদের নাতি-নাতনীরা তো আর সেই পিঠা, পুলি-পায়েস খেতে পায় না।

গ্রামবাংলার ঐতিহ্য এই খেজুরগাছ আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। যে হারে খেজুরগাছ নিধন হচ্ছে সে তুলনায় রোপণ করা হয় না। শীত মৌসুমে সকালে খেজুরের তাজা রস যে কতটা তৃপ্তিকর তা বলে শেষ করা যাবে না। কৃষি বিভাগতেও কখনো খেজুরের গাছ আবাদ নিয়ে কথা বলতে বা, কৃষি মেলায় খেজুরের গাছ রোপণে উদ্বুদ্ধ করার পরামর্শ দেয়া হয় না। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যে খেজুর ছিল এ অঞ্চলে অর্ধশতাধিক অবৈধ ইট ভাটায় খেজুর গাছ কেটে ইটপোড়ানোর কারনেই খেজুর গাছ শূন্য হয়ে পড়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে বলে উপজেলার বিজ্ঞজন মনে করেন।

এই বিষয়ে আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সি এস রেজাউল করিম বলেন, এই ঐতিহ্যবাহী খেজুর গাছ রোপণ ও সংরক্ষণের বিষয়ে আমরাও আগামীদিনে উদ্যোগ গ্রহণ করবো।